দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ছাত্রজীবনে রাজনীতির হাতেখড়ি। এরপর শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, পৌরসভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং দীর্ঘদিন বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব। রাজনীতির মাঠে পাঁচ দশকের বেশি সময়ের পথচলায় নানা বাঁক পেরিয়ে এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

রাষ্ট্রপতি পদে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছে বিএনপি। বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে তার প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠক শেষে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতার কথা জানান বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার পর মন্ত্রিসভা, বিএনপির মহাসচিব এবং দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই দিন রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তার মনোনয়নপত্রও নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। দুপুরে ড. মঈন খানের নেতৃত্বে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনে গিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেয়।
গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিন। বর্তমানে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে হবে।
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আজ বৃহস্পতিবার বিকেল চারটা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় ছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মোট তিনটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। এরপর হবে প্রার্থিতা যাচাই-বাছাই। ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হবে।
এবার রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুলের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করা হয়েছে। আজ বেলা ১১টার দিকে তার মনোনয়নপত্রও জমা দেওয়া হয়।
শেষ পর্যন্ত কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করলে দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এর আগে ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হয়েছিল। এরপর ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। বিরোধী দল থেকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দেওয়ার নজির ছিল না।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে। বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতসহ বিরোধী দলের সদস্যসংখ্যা সংরক্ষিত নারী সদস্যসহ ৯০। ফলে ভোটে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত। সে ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হচ্ছেন, এটা অনেকটাই পরিষ্কার।
ছাত্রজীবনেই রাজনীতির হাতেখড়ি
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক পথচলার শুরু ছাত্রজীবনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়ার সময় তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এবং এস এম হল শাখার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি। অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি শেষ করে তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা করার পর যোগ দেন সরকারি চাকরিতে।
শিক্ষকতা থেকে রাজনীতির মাঠে
১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল। তবে সরকারি চাকরির এই অধ্যায় খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৮৬ সালে চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেন তিনি।
এরপর তৃণমূলের রাজনীতিতেই গড়ে ওঠে তার নেতৃত্ব। ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী দেশব্যাপী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়।
বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে তিনি দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব এবং পরে মহাসচিবের দায়িত্বে আসেন।

দলের শীর্ষ নেতৃত্বে ওঠার আগে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
সংসদ ও সরকারের দায়িত্বে
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। ওই সময় থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। পরে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসন থেকে জয় পান। তবে দেশজুড়ে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
বিএনপির কঠিন সময়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব
মির্জা ফখরুল বিএনপির নেতৃত্বে আসেন দলটির সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটিতে। এক-এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপি নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও দমন-পীড়নের মুখে পড়ে।

২০১৮ সালে তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। পরে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। একই সময়ে ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে চলে যান এবং সেখান থেকেই দল পরিচালনা করতে থাকেন।
এই পরিস্থিতিতে দেশে থেকে বিএনপির রাজনৈতিক কার্যক্রম ও আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মির্জা ফখরুল। শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথের আন্দোলনেও তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে তিনবার কারাবরণ করেন তিনি।
মহাসচিব হিসেবে এক দশকের নেতৃত্ব
২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে মির্জা ফখরুলকে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব করা হয়। এরপর ২০১১ সালের ২০ মার্চ তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নেন। দীর্ঘ পাঁচ বছর এই দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির মহাসচিব হন তিনি।
ওই বছর বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে টানা এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন মির্জা ফখরুল।
দলের সংকটময় সময়ে বিএনপিকে সংগঠিত রাখা এবং রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রে তার ভূমিকার কথা দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা বিভিন্ন সময় তুলে ধরেছেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
এবার রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে
ছাত্র রাজনীতি ও শিক্ষকতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতৃত্ব অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত তিনি বিএনপির মহাসচিব হন। এবার সেই পথচলায় যুক্ত হতে যাচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি। ১৩তম জাতীয় সংসদে তার আসন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঠিক পাশেই।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতে, দলের দীর্ঘ সংকটের সময়ে মির্জা ফখরুলের ত্যাগ ও ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই তাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ী এলাকায় জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী। তিনি পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের দুইবারের সদস্য এবং পরে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য ছিলেন। এরশাদ সরকারের আমলে মন্ত্রীও ছিলেন তিনি। তার মা মির্জা ফাতেমা আমিন।
ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন মির্জা ফখরুল। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়াশোনা করেন। ছাত্র রাজনীতির মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশের পর মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মাধ্যমে তার রাজনৈতিক পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। পরবর্তীতে শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির পথ পেরিয়ে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন।
ব্যক্তিজীবনে পরিবারকেন্দ্রিক
রাজনীতির বাইরে স্ত্রী রাহাত আরা বেগম ও দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহকে নিয়ে মির্জা ফখরুলের পরিবার। সহধর্মিণীকে নিজের জীবনের ‘সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি’ হিসেবেও দেখেন তিনি। রাজনৈতিক জীবনের নানা সংকট ও প্রতিকূল সময়ে স্ত্রীর সাহস, ত্যাগ ও সহযোগিতার কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন বিএনপির এই নেতা।
দীর্ঘদিন একটি বীমা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনা ও পরিবারের দায়িত্ব সামলেছেন রাহাত আরা বেগম। মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের নানা সংকটেও তিনি দৃঢ়ভাবে পাশে ছিলেন। বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এবং সিডনিতে পোস্ট ডক্টরাল ফেলো এবং ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
ছাত্রজীবনের রাজনীতি থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা বিস্তৃত হয়েছে জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন স্তরে। এবার সেই দীর্ঘ পথচলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
/অ